মোনার বাবা


মোনার বাবা

মারুফ বিল্লাহ


[এক]

মা, তুমি ঘুমিয়েছো?
আমি ঘুমিয়ে গেলে আর জিগেশ করে লাভ কী? ঘুমিয়ে গেলে মানুষ কী কখনো কথা বলতে পারে?
বাবার উপর খুব রেগে আছে মোনা। ওর মাকে হারিয়েছে অনেক আগেই। আছে বলতে এক বাবা'ই। কিন্তু তার বাবাকেও ঠিকমতো কাছে পায় না। সকাল সকাল বের হয় তো হয়ই আসতে আসতে কখনো কখনো ঘুমিয়ে পড়ে ও। ওকে দেখাশোনার জন্য একজনকে রেখেছিলো বাবা। কিন্তু সেও রান্না-বান্না করেই ছুট লাগায় অন্য বাড়িতে। বাড়িতে একলাই পড়ে থাকে মোনা। ভীষন একা লাগে ওর।

সেদিন খুব কেঁদেছিল মোনা।

এইতো সেদিনের কথা করনার পর মাদরাসা সবে মাত্র খুলেছে। কয়দিন ক্লাস করতে না করতেই আবার হঠাৎ বন্ধ করে দেয় মাদরাসা। পাশের এলাকায় নাকি দখলদার হানারা বোমা ফেলেছে। কয়দিন পর মাদরাসা খুললে সে তার প্রিয় বান্ধবী মারইয়ামকে খুজে পায় না। দীর্ঘদিন ধরে আসছে না ও। কোথায় গেল তার বান্ধবী মারইয়াম? পরে জানতে পারে ওইদিনের বোমা হামলায় নাকি মারইয়াম সপরিবারে মারা গেছে। সেদিন খুব কেঁদেছিল মোনা।

ওর বাবাকে একদমই কাছে পায় না ও। একা একা সময় কাটে। নিজের খাবার নিজে নিয়ে খায়। কখনও বা পাশের বাড়ির ফাতেমার সাথে একসাথে খায়। এবাবেই কাটছে ওর দিনকাল।

ঘটনাটা গত রমাদানের। মোনা আর তার বাবা গিয়েছিলো 'মাসজিদুল আকসা'য় তারাবীহ পড়তে। ও ছিল ফাতেমার সাথে। সেই নামাজের আগে যে বাবার সাথে রমাদানের চাঁদ দেখার খুশির মূহুর্ত বাবার সাথে কাটানো শেষ সময় হবে তা আর কে জানতো? নামাজ পড়ার সময় এক বিকট শব্দে কানে তালা লেগে যায়। এরপর আর আর কিছুই মনে নেই!


[দুই]


আমার বাবা কই?
তোমার বাবা আসবে। চিন্তা করো না। শীঘ্রই আসবে, ইনশাআল্লাহ।মোনাকে সান্ত্বনা দিতে বললো, ফাতেমার মা। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়। মোনার অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না। সবসময় মুনাজাতে তার বাবা যাতে নিরাপদে বাড়ি আসে সে দোয়াই করে।

এদিকে তার বাবাকে বন্দি করে রেখেছে দখলদার বাহিনীর লোকজন। মেয়েটা কীভাবে আছে, কী করছে সে চিন্তাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার। নিশ্চয়ই ভালো আছে। খেলা করছে ফাতেমার সাথে। রমাদান মাস আবার চলে এলে বলে। মেয়ের কথা খুব মনে পড়ছে তার। আবার কী পারবে একসাথে সাহরী, ইফতারি করতে। মাসজিদুল আকসায় দু রাকাত নামাজ পড়তে?



[তিন]

৩৮ নং সেল। 
কোন বন্দীকেই খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। সিসিটিভিতেও তাদের পালানোর কোন দৃশ্য খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।
-কী যা তা বকছো? এতো টাইট সিকিউরিটির মধ্যে কীভাবে পালালো?
- জ্বী, স্যার। বেসিনের নিচে গর্ত করে সুড়ঙ্গ বানিয়ে পালিয়েছে।
- গর্ত করলো কীভাবে? তোমরা তে নিশ্চয়ই শাবাল আর কুড়াল দিয়ে আসো নি?
- আমরা ধারণা করছি ওইখানে আগে থেকেই গর্ত ছিল। আর ওরা তা টের পেয়ে ওদের খাওয়ার চামচ দিয়ে এসব করছে।
- বাহ। আর তোমরা কী করছিলে? যাও এখনই গোয়েন্দা বিভাগে খবর পাঠাও। সব সেল চেক করো। তোমরা আমার চাকরি খাবে! আর হ্যা ভুলেও এ খবর যাতে বাইরে না যায়।
- স্যার, জংলীগুলা কারাগারের বাইরে গর্ত দেখে আন্দাজ করে ফেলেছে। বাইরে সাংবাদিকরা অপেক্ষা করছে। ভিতরে পাঠাবো?
- কিহ! যাও আমার সামনে থেকে।

গর্ত করলো কীভাবে? তোমরা তে নিশ্চয়ই শাবাল আর কুড়াল দিয়ে আসো নি?

কোনদিক পরোওয়া করছে না মাহমুদ। ছুটছে তো ছুটছেই। পিছনে ফেলে আসছে ভয়ানক সব অত্যাচারের গল্প। ছুটে চলছে বহুদূর এ হিংস্র পশুদের থেকে। বাড়ির সামনে যখন মাহমুদ দাড়ালো তখন সকাল হয়ে গিয়েছে। কোথায় বাড়িতে গিয়ে মোনাকে জড়িয়ে ধরবে! কিন্ত একি এ জায়গা তার পরিচিত নয়। একেবারেই নয়। তার সামনে কাজ চলছে বহুতল ভবনের। কোথায় বাড়ী আর কোথায়ই বা তার আদুরে ছোট্ট মোনা? মাহমুদ ঠায় দাড়িয়ে দেখছে। চারপাশে কাটা তারের বেড়া। আর তার সামনে উড়ছে একটি পতাকা।সেই নিকৃষ্ট পিশাচদের পতাকা।





[কিছুটা বাস্তব ঘটনা থেকে আশ্রিত]
লেখক: মারুফ বিল্লাহ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি